
গফরগাঁওয়ের নিগুয়ারিতে ইটভাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও ঝুঁকিতে স্কুল-শিশুরা
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার ১৪ নম্বর নিগুয়ারি ইউনিয়নের কুরঢাই গ্রাম যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের জনপদে। গ্রামটির আশপাশে গড়ে ওঠা অন্তত ৬টি অবৈধ ইটভাটা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া, নির্বিচারে মাটি কাটা ও কৃষিজমি ধ্বংসের ফলে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষি ও শিক্ষাব্যবস্থা—সবকিছুই পড়েছে চরম ঝুঁকির মুখে। বিষাক্ত ধোঁয়ায় নীরব মৃত্যুঃ স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটাগুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে থাকে কুরঢাই গ্রাম ও আশপাশের এলাকা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশু ও বয়স্কদের ওপর। হাঁপানি,শ্বাসকষ্ট,চোখ জ্বালা, চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গ্রামের শিশুরা। একাধিক অভিভাবক জানান, “বাচ্চাদের সারাক্ষণ কাশি-জ্বর লেগেই আছে। ডাক্তার দেখালেও ধোঁয়া বন্ধ না হলে আর কী হবে?”
ধ্বংস হচ্ছে ফসলি জমি,কাটা পড়ছে মায়ের মতো মাটি! অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,এসব ইটভাটার কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য ফসলি জমি কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে,যা সরাসরি কৃষি আইন ও পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন। ফলে বহু কৃষকের জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ধান,সবজি ও মৌসুমি ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
একজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাপ-দাদার জমি চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেল। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি আসে।”
ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিশুদের ভবিষ্যৎ: সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–
ইটভাটাগুলোর অবস্থান গ্রামের বসতবাড়ি ও স্কুলের আশপাশে। প্রতিদিন স্কুলগামী ছোট ছোট শিশুদের ধোঁয়ার ভেতর দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। স্থানীয় শিক্ষকরা বলছেন,ক্লাস চলাকালেও ধোঁয়ার কারণে জানালা বন্ধ রাখতে হয়,এতে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রভাবশালীদের দাপটে নীরব প্রশাসন! গ্রামবাসীদের অভিযোগ,ইটভাটার মালিকরা স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো অভিযান বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, “প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়। তাই সবাই চুপ।” রাষ্ট্রের হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ,তবু অচলাবস্থা! এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না আসায় জনমনে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কুরঢাই গ্রামসহ আশপাশের এলাকা স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে,যার ক্ষতি আর কখনো পূরণ করা সম্ভব হবে না। আইন কী বলছেঃ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, বসতবাড়ি,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির আশপাশে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ভাটা পরিচালনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু কুরঢাই গ্রামের ক্ষেত্রে আইন যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে–অবৈধ ইটভাটাগুলো কার ছত্রচ্ছায়ায় চলছে? কেন দীর্ঘদিন ধরে আইন প্রয়োগ হচ্ছে না? গ্রামের শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের দায় কে নেবে? অবিলম্বে দাবি: স্থানীয়রা অবিলম্বে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পরিবার গুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। কুরঢাই গ্রামের এই চিত্র শুধু একটি গ্রামের নয়—এটি সারাদেশে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির একটি জীবন্ত উদাহরণ। এখনই যদি রাষ্ট্র কঠোর না হয়,তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব ধোঁয়া,ধ্বংস আর অসহায়তার এক বিষাক্ত উত্তরাধিকার।

ফুকরা স্ট্যান্ডে অটোভ্যান রাখার স্থান ও জনসাধারণের চলাচলের রাস্তায় মাটি ভরাট 










