
ময়মনসিংহ ডিএনসির হিসাব রক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
রাষ্ট্রের মাদকবিরোধী অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। যে সংস্থার ওপর দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব, সেই সংস্থার একটি জেলা কার্যালয় ঘিরে যদি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ জমতে থাকে, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়—প্রশ্ন তোলে পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিয়ে। ময়মনসিংহ জেলা ডিএনসি কার্যালয়ের হিসাব রক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী এবং দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্যমতে—এই অভিযোগগুলো ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্রে। দীর্ঘদিন একই পদে বহাল, প্রশ্নবিদ্ধ বদলি প্রক্রিয়া! ডিএনসির বিধিমালা অনুযায়ী,কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর এক দপ্তরে দীর্ঘ সময় অবস্থান সীমিত থাকার কথা। অথচ এম এ কবির প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে হিসাব রক্ষক পদে বদলির খসড়া তালিকায় এম এ কবিরের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা রহস্যজনকভাবে বাদ পড়ে। অভিযোগ রয়েছে—উচ্চপর্যায়ে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই এই বদলি ঠেকানো হয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন,“একই জায়গায় এতদিন থাকা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বদলির তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পেছনে কী ঘটে—সেটা দপ্তরের ভেতরে সবাই কমবেশি জানে।” টিএ বিল পাস মানেই কমিশন? ডিএনসি ময়মনসিংহ কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ,টিএ (ভ্রমণ ভাতা) বিল পাস করতে হলে এম এ কবিরকে বাধ্যতামূলকভাবে বিলের প্রায় ২০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী,কমিশন না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকে। কেউ কেউ দাবি করেন,বছরের পর বছর বিল ঝুলে থাকার ঘটনাও রয়েছে।
এক কর্মচারী বলেন,“বিল পাস করা তার দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে এখানে দায়িত্ব নয়,একটা অঘোষিত বাণিজ্য চলছে।” ভুয়া বিল–ভাউচারে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ! অভিযোগ রয়েছে—স্টেশনারি,এসি,প্রসেসিং ম্যাটেরিয়ালসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ক্রয়ের নামে ভুয়া বিল–ভাউচার তৈরি করে নিয়মিত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। ডিএনসির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়,সম্প্রতি ডিজি অফিস থেকে আনুষঙ্গিক খাতে বরাদ্দ পাওয়ার পর কাগজ-কলম ও অফিস সামগ্রী কেনার নামে প্রায় ৫০–৬০ হাজার টাকা ভুয়া ভাউচারে উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “বিল আগে তৈরি হয়, দোকান পরে। অনেক সময় বাস্তবে কোনো মালামালই আসে না—সব শেষ হয় কাগজে।”
দেশী মদের চালান ঘিরে বাধ্যতামূলক ঘুষের অভিযোগ! সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশী মদের দোকান মালিকদের কাছ থেকে। বিধি অনুযায়ী,দেশী মদ উত্তোলনের জন্য সরকারি চালান কাটা বাধ্যতামূলক। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—চালান কাটতে হলে এম এ কবিরের কাছে যেতে হয় এবং প্রতি চালান বাবদ ৫০০–৬০০ টাকা ‘অঘোষিত ফি’ দিতে হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে—সরকারি চালান কোড ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়! ব্যবসায়ীরা নিজেরা চালান কেটে আনলেও তা গ্রহণ করা হয় না! এই বিষয় নিয়ে গফরগাঁও ও নাসিরাবাদ এলাকার দেশী মদের দোকানের সঙ্গে তার বিরোধ চরমে ওঠে। ১৮ হাজার টাকা মাসোয়ারার অভিযোগ! সূত্র জানায়,চলতি মাসের ১৩ জানুয়ারি নাসিরাবাদ দেশী মদের দোকানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন নিজে আলোচনায় বসেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী,আলোচনার একপর্যায়ে এম এ কবিরকে মাসিক ১৮ হাজার টাকা ‘মাসোয়ারা’ দেওয়ার প্রস্তাব উঠে আসে। এই অভিযোগ ডিএনসির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চাকরি পাওয়ার শুরু থেকেই বিতর্ক? এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের তদবিরে ১৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এম এ কবির চাকরি পান—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ভয় আর নীরবতার সংস্কৃতি ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে জানান, প্রতিবাদ করলেই বদলি,হয়রানি কিংবা হুমকির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের ভাষায়,“এই দুর্নীতি চলতে থাকলে পুরো অফিসের কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।” অভিযুক্তের বক্তব্যঃ সব অভিযোগ অস্বীকার করে এম এ কবির বলেন, “এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ। কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। আমি নিয়ম মেনেই কাজ করি।” রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নীতিনৈতিকতার প্রশ্নঃ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে,মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতি প্রবেশ করলে মাঠপর্যায়ের অভিযান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মাদকচক্র আরও শক্তিশালী হয়—যা রাষ্ট্রের জন্য সরাসরি ঝুঁকি। জোর দাবিঃ সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি—এম এ কবিরের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন-বদলি বিধি লঙ্ঘনের কারণ অনুসন্ধান-সব বিল– ভাউচারের ফরেনসিক অডিট-টিএ বিল ও দেশী মদের চালান সংশ্লিষ্ট অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা–ময়মনসিংহ জেলা ডিএনসির হিসাব রক্ষক এম এ কবিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয় নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার বড় সংকেত। এখনই নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে,দুর্নীতির ভারে শুধু একটি দপ্তর নয়—মাদকবিরোধী রাষ্ট্রীয় লড়াইও দুর্বল হয়ে পড়বে। সত্য উদঘাটনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

অসুস্থ সাংবাদিক আসাদুজ্জামান বাদলকে দেখতে বিএনপি নেতৃবৃন্দের 









