
শিক্ষার আলোয় তিন দশক: একটি গৌরবগাঁথার অধ্যায়
মুক্তাশা দীনা চৌধুরী
ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, শিক্ষার প্রতিশ্রুতি শিক্ষাকোনো পণ্য নয়, এটি একটি জাতির সবচেয়ে মহার্ঘ্য বিনিয়োগ। যে বিনিয়োগের মুনাফা হিসাবের কলামে ধরা পড়ে না, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রস্তরে জ্বলে উঠে জ্ঞানের অনির্বাণ শিখা। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি এই প্রতিষ্ঠান পদার্পণ করতে যাচ্ছে তার প্রতিষ্ঠার ৩০তম বর্ষে। তিন দশকের অধ্যায়জুড়ে লালিত স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক জীবন্ত ইতিহাস।
আশির দশকের কথা। দেশ তখন উন্নয়নের নবযাত্রায়। কিন্তু স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবুল হাসান এম. সাদেকের চিন্তা ছিল আরও গভীরে। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, টেকসই উন্নয়নের একমাত্র সোপান হলো শিক্ষা। তাঁর দর্শন ছিল পরিষ্কার—শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি হতে হবে মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ, আলোকিত চিন্তার উন্মেষ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বাহন। “স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষা”—এই মহৎ আদর্শকে হাতিয়ার করেই ১৯৯৬ সালের ৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু হয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের। একটি স্বপ্ন ছিল—বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম দশক ছিল প্রতিষ্ঠান গড়ার সংগ্রাম।দ্বিতীয় দশক ছিল প্রসার ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের। তৃতীয় দশকে এসে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বিশ্বস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, সামাজিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সংখ্যায় নয়, গুণে এর সাফল্য পরিমাপ করতে হয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী যারা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আজ দেশে-বিদেশে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন, তারাই এর জীবন্ত সাক্ষী। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা যাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন প্রায় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াত, তারা পেয়েছে সহজলভ্য খরচে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ। এশিয়ান ইউনিভার্সিটিঅব বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পায় নৈতিকতা, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রফেসর সাদেকের দর্শনের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরির জন্য তৈরি করলে হবে না, তাকে তৈরি করতে হবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত হওয়ার জন্য। এখানকার একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরেও রয়েছে নানা সহশিক্ষা কার্যক্রম—সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সামাজিক সেবামূলক কাজ, স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম। এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলা হয় সৃজনশীলতা, সহনশীলতা ও দেশসেবার মনোভাব। শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ কখনো বিফলে যায় না। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ৩০ বছরের ইতিহাস তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা আজ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে সাফল্য দেখাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণা ও উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দিচ্ছে। স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তির প্রয়োগ—এই ক্ষেত্রগুলোতে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রয়েছে বিশেষ প্রগ্রাম ও সহায়তা। তিন দশকের অভিজ্ঞতাও সাফল্য নিয়ে এবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ মুখোমুখি হচ্ছে নতুন যুগের চ্যালেঞ্জের। চতুর্থ দশকের মূল লক্ষ্য হবে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা, গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার। বিশ্বায়নের এই যুগে স্থানীয় প্রেক্ষাপট বুঝতে পারার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং প্রতিযোগিতার যোগ্যতা অর্জন এখন অপরিহার্য। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই দিকে পদক্ষেপ নিচ্ছে—আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো, শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিনিময় প্রগ্রাম চালু করা এবং পাঠ্যক্রমে বিশ্বমান অন্তর্ভুক্ত করা। একটিজাতির উন্নয়নের সূচনা হয় শ্রেণিকক্ষ থেকে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ তার ৩০ বছরের যাত্রায় এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষার আদর্শকে ধারণ করে এটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, একটি সামাজিক আন্দোলনেরও নাম। প্রফেসর ড. আবুল হাসান এম. সাদেকের দর্শন ও নেতৃত্বে এবং দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ আজ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার একটি অনন্য উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানের ৩০তম বর্ষ শুধু অতীতের সাফল্য স্মরণেরই সময় নয়, ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রতিশ্রুতিরও সময়। শিক্ষা যে জাতির ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ—এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের তিন দশকের যাত্রা তারই বাস্তব প্রমাণ। আলোকিত মানুষ গড়ার এই নিরব অভিযাত্রায় এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দীপস্তম্ভ হয়ে থাকবে আগামী দিনগুলোতেও।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

অসুস্থ সাংবাদিক আসাদুজ্জামান বাদলকে দেখতে বিএনপি নেতৃবৃন্দের 















